বিস্তারিত

মরহুম আমিনুল করিম মজুমদার খোকা মিয়া আত্মকাহিনী

আপডেট টাইম : 3 weeks ago
মরহুম আমিনুল করিম মজুমদার খোকা মিয়া আত্মকাহিনী

মাছুম আহম্মেদ, ফেনী প্রতিনিধিঃ মুক্তিযুদ্ধের এ অন্যতম সংগঠকের জন্ম ১৯২৭ সালের ১ জানুয়ারি ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার সলিয়া গ্রামে। বাবার নাম সুলতান মজুমদার ও মায়ের নাম আসিয়া খাতুন।

 

ষাটের দশকের এ টগবগে তরুণ তার তারুণ্য দিয়ে অবহেলিত, শোষিত জাতির অন্তঃকরণে উপনিবেশের বিরুদ্ধে স্বোচ্চার হওয়ার অগ্নিশিখা চালিয়ে দিয়েছিলেন। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানী শাসকদের শোষণ প্রক্রিয়া থেকে এদেশের জনগণকে মুক্তির লক্ষ্যে তিনি তার যৌবনের আলো দিয়ে সাধারণ মানুষকে আলোকিত করে সংগ্রামী চেতনায় উজ্জীবিত হতে সাহায্য করেছিলেন।

 

খোকা মিয়া মুক্তিযুদ্ধের ২ নং সেক্টর এর অন্যতম মুক্তিযোদ্ধা ও সংগঠক ছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় রাজাকার ও আল বদরদের প্রতিহত করার জন্যে এলাকায় এলাকায় গণসংযোগ করতেন। তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর রক্তচক্ষু ও মরণঘাতি বেয়নেট উপেক্ষা করে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুক্তিপাগল তরুণদের সংগ্রহ করে যুদ্ধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণের জন্য ভারত পাঠাতেন এবং নিজে গেরিলা যোদ্ধাদের অভিযান পরিচালনা করতেন।

 

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে ফেনীবাসীর ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয় ।আর এতে তার অবদান সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। তিনি পাকবাহিনী রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে বিভিন্ন গ্রাম থেকে মুক্তি পাগল তরুণদের সংগ্রহ করেন। যুদ্ধে প্রশিক্ষণের জন্য তিনি মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে ভারতের আমজাদ নগর ও সাড়াসীমা ক্যাম্প পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি গেরিলা যোদ্ধাদের অভিযান পরিচালনা করেছিলেন ।রাজাকার-আলবদরদের প্রতিহত করার জন্য তিনি এলাকার জনগণকে আহ্বান জানিয়েছিলেন । যুদ্ধকালীন পাকিস্তানী বাহিনী ও তার দোসররা তার ও তার চাচার ৯ টি ঘর পুরিয়ে ছারখার করে দেয়।

 

দেশের স্বাধীনতা লাভের পর এলাকাবাসী তাকে মুক্তি সংগ্রামের নেতা হিসেবে বরণ করে নেয় । তার খ্যাতি দেশে ছড়িয়ে পড়লে সেনাপতি মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী পরশুরাম এসে তাকে অভিনন্দন জানান ।

 

স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান ও মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর কাছে তিনি সুপরিচিত ছিলেন।

 

খোকা মিয়া ভোটের মাধ্যমে ফেনী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন ১৯৭৩ সালে। তার সাথে সভাপতি ছিলেন এবি এম তালেব আলী। বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার পর সারাদেশব্যাপী আওয়ামী লীগ নেতাদের গণ গ্রেফতার করার সময় তিনিও গ্রেফতার হয়েছিলেন।

 

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে স্বপরিবারে হত্যার পর আওয়ামী লীগকে ধ্বংস করার জন্য নীলনকশা তৈরিকারীরা যখন অপরাজনীতিতে লিপ্ত হয়, তখন খোকামিয়াদের জেলখানায় বন্ধী করে অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়।তখনো হাল ছাড়েননি বঙ্গবন্ধুর এ সৈনিকরা। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুঃসময়ে দেশের জেলায় জেলায় যারা আওয়ামীলীগের জন্য সর্বস্ব ত্যাগ স্বীকার করে আওয়ামী লীগকে টিকিয়ে রাখার চেষ্ঠা করেছেন তাদের মধ্যে খোকা মিয়া ছিলেন অন্যতম।

 

১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর জেলে থাকা অবস্হায় পুনরায় জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন খোকা মিয়া। যদিও তখন অনেকে ভয়ে ঘা ঢাকা দিয়েছিলেন। ১৯৭৭ সালে তিনি আবারো জেলে থাকা অবস্থায় তৃতীয় বারের মত জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

মরহুম আমিনুল করিম খোকা মিয়া বঙ্গবন্ধু আদর্শ ও নীতিকে ধারন করে আওয়ামীলীগের রাজনীতিতে বলিষ্ঠ ভুমিকা রেখে গেছেন। ১৯৭৯ সালে তিনি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বীতা করেছিলেন।ওই সময়ে জাসদের জাফর ইমাম বীর বিক্রম এর কাছে অল্প ভোটে পরাজিত হন।

 

১৯৮৫ সালে পরশুরামে ১ম উপজেলা নির্বাচনে খোকা মিয়া অংশগ্রহণ করেন এবং বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হন।স্বাধীনতা লাভের পর থেকে তার চিন্তা ছিল এলাকার জনগণকে কিভাবে শিক্ষিত করা যায় ।তিনি বুঝেছিলেন একমাত্র শিক্ষার মাধ্যমেই এ অনগ্রসর এলাকাবাসীকে অগ্রগতির দিকে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ।

 

উচ্চপর্যায়ের শিক্ষা ব্যতীত জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।এ উদ্দেশ্যে তিনি ব্যক্তিগত উদ্যোগে পরশুরাম সরকারি কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। এ কলেজ স্থাপনের ফলে অত্র এলাকার জনগণ উপকৃত হয়।যার অবদান এলাকাবাসী চিরদিন স্মরণ রাখবে। এছাড়াও আরো অসংখ্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা তিনি।

 

এলাকাবাসীর স্বাস্থ্য সুরক্ষার কথা চিন্তা করে তিনি “পরশুরাম স্বাস্থ্য প্রকল্প “নামে একটা হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন । কালক্রমে আধুনিকায়নের ফলে হাসপাতালটি অনেক উন্নতি লাভ করেছে এবং এলাকাবাসী এখন উন্নত সেবা পাচ্ছে।২৭টি গ্রামের মানুষের সেচ প্রকল্পের সুবিধার জন্য ১৯৭২ সালে নিজস্ব অর্থায়নে বেড়াবেড়িয়া বাঁধ নির্মাণ করেন খোকা মিয়া। তাছাড়াও খোকা মিয়ার প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান সমূহঃ

 

১। পরশুরাম সরকারি ডিগ্রী, কলেজ পরশুরাম সরকারি হাসপাতাল, নতুন বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, কেতরাঙ্গা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, আমজাদহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, মালিপাথর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়

 

অন্যতম উ‌দ্যোক্তাঃ চিথলিয়া নাসির উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়, পরশুরাম গার্লস উচ্চ বিদ্যালয়, পরশুরাম মডেল আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়, পোস্ট অফিস মসজিদ বর্তমান উপজেলা মসজিদ, পরশুরাম কেন্দ্রীয় মন্দির, বঙ্গবন্ধু উচ্চ বিদ্যালয় বর্তমান চাঁনগাজী উচ্চ বিদ্যালয়।

 

খোকা মিয়ার জীবদ্দশায় ছিল অত্যান্ত সম্মানের ও শ্রদ্বার।কারণ তাঁর নীতি আদর্শ ছিল লোভ লালসাহীন। তাই তার জীবন যাপন পদ্ধতি ছিল সরল ও অনাড়ম্বর। ব্যক্তি জীবনে তো বটেই রাজনীতিতেও নিজেকে বিরল পরিচ্ছন্ন নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন।

 

দলের চরম সংকটে তিনি ছিলেন বড় কান্ডারি । তিনি নিজের সম্পত্তি বিক্রি করে দলের জন্য ব্যায় করতেন। খোকা মিয়ার বঙ্গবন্ধুর আদর্শকে ধারন করে রাজনীতি করতেন। তার রাজনৈতিক জীবদ্দশার বর্ণাঢ্য জীবন থেকে অনেক কিছু শিখার ও জানার রয়েছে বর্তমান প্রজন্মের রাজনীতিবিদদের। তিনি সব সময় পান্জাবী ও ঐতিহ্যবাহী খোকা লুঙ্গি পরিধান করতেন।

 

সব জাঁকজমকপূর্ন অনুষ্ঠানে তিনি এ পোশাকে উপস্থিত হতেন। কারণ তিনি বিশ্বাস করতেন পোশাক নয় আদর্শ ও গুনই মানুষের ভূষন।

 

এছাড়াও তিনি বলতেন-"আমি যদি এমপি হই তাহলে এ লুঙ্গি পড়েই সংসদে যাব" । আমিনুল করিম মজুমদার খোকার মিয়ার নামকে স্মৃতিতে স্বরনীয় করে রাখতে উপজেলা পরিষদ মিলনাতনকে "খোকা মিয়া মিলনায়তন" নামকরণ করা হয়েছে।

 

দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১৯৯৪ সালের ২৬ শে জুন চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা ডায়াবেটিস হাসপাতালে মৃত্যুবরন করেন(ইন্না লিল্লাহে ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন)।

 

আমিনুল করিম খোকা মিয়ার মৃত্যুর সংবাদ শুনে পরবর্তীতে তাঁর পরিবারকে সমবেদনা জানানোর জন্য ১৯৯৪ সালে ৩১ জুলাই ফেনী জেলার পরশুরাম উপজেলার সলিয়া গ্রামে ছুটে এসেছিল তৎকালীন বিরোধীদলীয় নেত্রী বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী_শেখ_হাসিনা।

 

বিডি প্রভাত/আরএইচ

নিউজটি শেয়ার করুন

খবর সম্পর্কিত ট্যাগ..

ফেনী
মন্তব্য দিন
We'll never share your email with anyone else.

শিরোনাম