শিক্ষা অফিসারের লাথি খাওয়া সেই প্রধান শিক্ষক উল্টো বরখাস্ত

শিক্ষা অফিসারের লাথি খাওয়া সেই প্রধান শিক্ষক উল্টো বরখাস্ত

গোপালগঞ্জ প্রতিনিধি: গোপালগঞ্জে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের টাকার ভাগ না পেয়ে প্রধান শিক্ষককে দুই’দফায় মারধর করে হাসপাতালে পাঠিয়েছে সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং বিদ্যালয়টির ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির লোকজন।

গত ৩ অক্টোবর এবং ৫ অক্টোবর দুই দফায় ওই শিক্ষককে মারধরের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় ভুক্তভোগী শিক্ষক কোনো বিচার পাননি। উল্টো তার
বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা দিয়ে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।

প্রাথমিক শিক্ষা বিভাগের বিভাগীয় উপপরিচালকের অফিস আদেশে বলা হয়, ‘২৮ নং উরফি বড়বাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি বিশ্বাসের বিরুদ্ধে সরকারি কাজে বাঁধা প্রদান এবং পরিদর্শনকারী কর্মকর্তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা, ২০১৮ এর বিধি ৩ (খ) মোতাবেক অসদাচারণের দায়ে বিধি ১২ (১) অনুযায়ী ৫ অক্টোবর ২০২১ তারিখ হতে সাময়িক বরখাস্ত করা হলো।’

প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি বিশ্বাস বলেন, বিদ্যালয়ের উন্নয়ন কাজের বরাদ্দের টাকার পুরোটাই তিনি বিদ্যালয়ের উন্নয়নে ব্যয় করতে চান। কিন্তু সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা দু’জনই চান বরাদ্দের ভাগ। এ নিয়েই মূলত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে তার দ্ব›দ্ব। এ কারণেই মারধর খেয়ে তাকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে।

গত ৩ অক্টোবর বিদ্যালয় ছুটির আগেই সদ্যভূমিষ্ট হওয়া নবজাতক ও অসুস্থ স্ত্রীকে দেখতে ক্লিনিকে যান প্রধান শিক্ষক মনোজ কান্তি বিশ্বাস। ওই দিন স্কুল ছুটির পর বিকেলে সংশ্লিষ্ট ক্লাস্টারের দায়িত্বরত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা গৌতম চন্দ্র রায় স্কুল পরিদর্শনে আসেন। তার সঙ্গে যান পার্শ্ববর্তী গোপালপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এক সহকারী শিক্ষক।

কর্মকর্তা আসার সংবাদ পেয়ে বিদ্যালয়ে ফিরে আসি আমি। পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হতে পারে ধারণা করে মোবাইলের ভিডিও চালু করে সেখানে উপস্থিত হই। সেখানে উপস্থিত হওয়া মাত্রই স্কুলের দুই শিক্ষকের সামনে আমাকে লাথি ও কিলঘুষি মারেন সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা । মার খেয়ে সেখান থেকে দৌড়ে নিরাপদ স্থানে যাই আমি।’

অভিযোগে ভুক্তভোগী প্রধান শিক্ষক বলেন, মঙ্গলবার (৫ অক্টোবর) সকাল ৯টায় আমি বিদ্যালয়ে গেলে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খানের সঙ্গীয় লোকজন আমাকে স্কুল থেকে জোর করে বের করে দিতে চায় এবং বেধড়ক মারপিট করে সভাপতির লোকজন। মোবাইলে ঘটনার ভিডিও ফেসবুকে দেওয়া হলে ফোন কেড়ে নিয়ে গিয়ে ধারণকৃত ভিডিও চিত্র মুছে ফেলে তারা।

নাম প্রকাশ না করা শর্তে ঘটনার এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, ‘৩ অক্টোবর বিকেলে স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খানের উপস্থিতিতে সহকারী উপজেলা শিক্ষা অফিসার প্রধান শিক্ষককে লাথি মারে। আবার ৫ অক্টোবর সকালে ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির লোকজন প্রধান শিক্ষককে বেধড়ক মারপিট করেন। প্রধান শিক্ষক একটু সহজ সরল প্রকৃতির।

তবে লোকজনের মারপিটে কেমন যেন তিনি অস্বাভাবিক হয়ে পড়েন। মাথায় এবং পিঠে তাকে প্রচন্ডভাবে মারা হয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে কেউ মিথ্যা কথা বললে সৃষ্টিকর্তা তাকে ক্ষমা করবে না।

প্রধান শিক্ষকের স্ত্রী কাকলী হীরা এব্যাপারে থানায় একটি অভিযোগপত্র দাখিল করেছে। মনোজ কান্তি বিশ্বাস গোপালগঞ্জ ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন।

এদিকে, দু’টি ঘটনারই প্রত্যক্ষদর্শী ওই স্কুলের সহ:শিক্ষক শিল্পী খানম ও শিপ্রা বিশ্বাস সাংবাদিকদের সামনে মুখ খুলতে না চাইলেও বলেছেন, তাদেরকে দিয়ে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে মনগড়া লিখিত অভিযোগ নেওয়া হয়েছে।

তারা একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন এবং বলেন, প্রধান শিক্ষকের ওপর যে হামলা হয়েছে তা হৃদয়-বিদারক এবং চরম অমানবিক। ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি মো. মহিদুল আলম মাহাত্তাব খান প্রধান শিক্ষকের ওপর হামলার বিষয়টিকে অস্বীকার করে বলেন, তার ওপর কোনো হামলার ঘটনা ঘটেনি। এ অভিযোগ অবান্তর।

সাময়িক বরখাস্তের বিষয়টি নিয়ে প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলতে গেলে সে এলোমেলো কথা বলে মোবাইলে ভিডিও করতে শুরু করে। তাই তার কাছ থেকে মোবাইল নিয়ে ভিডিও চিত্র মুছে ফেলা হয়েছে; কিন্তু তাকে কোন মারধর করা হয়নি।

এব্যাপারে অভিযুক্ত সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সাথে কথা বলতে গেলে ক্যামেরা সামনে হাত দিয়ে ক্যামেরা বন্ধ করে দেন এবং হাত জোর করে এ বিষয়ে সংবাদ প্রকাশ না করার জন্য অনুরোধ জানান। পরে তিনি রুম থেকে বেরিয়ে যান।

জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনন্দ কিশোর সাহা জানান, এব্যাপারে প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে একই বিদ্যালয়ের দু’জন সহকারী শিক্ষক ও সহকারী উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছ থেকে লিখিত অভিযোগ পেয়ে মনোজ কান্তি বিশ্বাসকে সাময়িক বরখাস্তসহ তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ শিক্ষক সমিতি, গোপালগঞ্জ জেলা শাখার সভাপতি রাজু আহমেদ লেলিন বলেন, এই ঘটনার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাই। শিক্ষক সমিতি অবশ্যই এর প্রতিবাদে করবে।

বিডি প্রভাত/জেইচ

Spread the love