লঞ্চে-বাসে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ি ফিরতে মরিয়া মানুষ

লঞ্চে-বাসে স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই, বাড়ি ফিরতে মরিয়া মানুষ

নিজস্ব প্রতিবেদক: করোনার বিস্তার ঠেকাতে চলমান বিধিনিষেধ শিথিলের পর বাড়ি ফিরতে শুরু করেছেন মানুষ। পথে পথে ভোগান্তি আর ঝক্কি-ঝামেলা থাকলেও যেন বাড়ি ফেরার প্রতিযোগিতা চলছে মানুষের মধ্যে। তবে এসব মানুষের কেউ স্বাস্থ্যবিধি মানছেন না। সবার মধ্যেই স্বাস্থ্যবিধির ব্যাপারে সবার মধ্যেই চরম উদাসীনতা ভাব।

গাবতলী বাস টার্মিনাল থেকে বাস ছেড়ে যাওয়ার সময় স্বাস্থ্যবিধি মানতে অর্ধেক সিট খালি রাখতে দেখা গেছে। ঈদের আগে ঘরমুখো মানুষের চাপ বেশি থাকায় এবং যানজটের কারণে মহাসড়কে গাড়ি আটকা পড়ায় যাত্রীদের বাসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে টার্মিনালে বা রাস্তায়৷

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাড়ি ফিরতে মরিয়া মানুষ

কমলাপুর রেল স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড় দেখা গেছে। কমলাপুরে স্বাস্থ্যবিধি মেনে ট্রেন চলাচল করতে দেখা গেলেও স্বাস্থ্যবিধির বালাই নেই বাস কাউন্টারগুলোতে। যে যেভাবে পারছেন বাড়ি ফিরছেন।

গাবতলীতে বাড়িফেরা মানুষের অধিকাংশের মধ্যে স্বাস্থ্যবিধি মানার প্রবণতা দেখা যায়নি। যাত্রীদের ভিড়ের কারণে সেখানে নেই শারীরিক দূরত্ব। দূরপাল্লার বাসে দুই সিটে একজন করে নেয়া হলেও ট্রাক, প্রাইভেটকার, মাইক্রোবাসে মানা হচ্ছে না এই দূরত্ব। এসব যানে গাদাগাদি করে রাজধানী ছাড়ছেন ঘরমুখো মানুষ। 

ঈদযাত্রায় অন্যান্য সময়ের মতো যাত্রীদের হুড়োহুড়ি নেই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। গতকাল সকাল থেকে কমলাপুর রেলস্টেশন ঘুরে এ চিত্র দেখা গেছে।

স্টেশন কর্তৃপক্ষ বলছে, অনলাইনে টিকিট কাটা ও টিকিট ছাড়া স্টেশনে প্রবেশ করতে না দেয়ার কারণে স্টেশনে হুড়োহুড়ি নেই। করোনাভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে অর্ধেক যাত্রী নিয়ে চলাচল করছে ট্রেন। টিকিট চেক করে যাত্রীদের স্টেশনে প্রবেশ করানো হচ্ছে। সঙ্গে হ্যান্ড মাইকে স্বাস্থ্যবিধি মানার জন্য যাত্রীদের অনুরোধ জানানো হচ্ছে। পুরো স্টেশন জুড়ে ছড়িয়ে আছেন রোবার স্কাউটের সদস্যরা। কারো মুখে মাস্ক না থাকলে মাস্ক পরার অনুরোধ জানাচ্ছিলেন তারা। স্বাস্থ্যবিধি মানা সংক্রান্ত বিভিন্ন স্লোগানের ফেস্টুনও দেখা গেছে তাদের হাতে। যাত্রী প্রবেশ মুখেই রাখা আছে হ্যান্ড স্যানিটাইজার।

লকডাউন শিথিলের প্রথম ও দ্বিতীয় দিন সদরঘাট লঞ্চ টার্মিনালে ছিল যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড়। সেই তুলনায় গতকাল তৃতীয় দিন শনিবার এর দ্বিগুণ ভিড় দেখা গেছে। গাদাগাদি করে পাল্লা দিয়ে লঞ্চে ভিড় করছে মানুষ। উপেক্ষিত ছিল স্বাস্থ্যবিধি। পরিবার পরিজনের সঙ্গে ঈদ করার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যবিধির তোয়াক্কা না করেই রাজধানী ছেড়ে বাড়ি যাচ্ছেন হাজারো মানুষ। 

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাড়ি ফিরতে মরিয়া মানুষ

মাস্ক পরা ও সামাজিক দূরত্ব মানা দূরের কথা লঞ্চ কর্তৃপক্ষকে প্রবেশ পথে হ্যান্ড স্যানিটাইজার স্প্রে করতেও দেখা যায়নি। তারা শুধু যাত্রী নিতে ব্যস্ত। এছাড়া লঞ্চগুলোতে নির্ধারিত ভাড়ার অতিরিক্ত ভাড়া ও অতিরিক্ত যাত্রী নিতে দেখা গেছে। তবে এ বিষয় মানতে রাজি না বিআইডব্লিউটিএ ও লঞ্চ মালিকরা। তারা বলেন, স্বাস্থ্যবিধি যথাযথ মেনেই লঞ্চ ছাড়া হচ্ছে।

ঈদে ঘরমুখো মানুষ ছাড়াও মহাসড়কে পশুবাহী ট্রাক বেড়ে যাওয়ায় ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কে যানবাহনের চাপ বেড়ে গেছে। এর ফলে উত্তরের পথে যাওয়া এই মহাসড়কটিতে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। গভীর রাত থেকে বঙ্গবন্ধু সেতুর পূর্বপাড় থেকে টাঙ্গাইলের ঘারিন্দা পর্যন্ত মহাসড়কের প্রায় ২২ কিলোমিটার এলাকায় সড়কে যানবাহন চলছে থেমে থেমে। এতে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে যাত্রী ও চালকদের।

অন্যদিকে কোরবানির গরুবাহী ট্রাক ও ঘরমুখো মানুষের গাড়ির চাপের কারণে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে সড়কে যানজট সৃষ্টি হয়েছে।শুক্রবারও সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সড়কটিতে যানজট লেগেছিল।

স্বাস্থ্যবিধি উপেক্ষা করে বাড়ি ফিরতে মরিয়া মানুষ

এদিকে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের তীব্র যানজটের ফলে চালক ও ঘরমুখো যাত্রীদের চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েন নারী ও শিশুরা। এ সময় বাসের যাত্রী ও পথচারীদের ভোগান্তি পোহাতে হয়। অনেকে বাধ্য হয়ে বাস থেকে নেমে হেঁটেই রওনা দেন গন্তব্যের পথে। তবে যান চলাচল স্বাভাবিক করতে কাজ করছে হাইওয়ে পুলিশ ও গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশ। 

সরেজমিনে দেখা যায়, সকাল থেকে টঙ্গী ব্রিজের পর থেকে স্টেশন রোড, চেরাগআলী, গাজীপুরা, বোর্ড বাজার, ছয়দানা, বাসন সড়ক, ভোগড়া বাইপাস ও চান্দনা চৌরাস্তা মোড় পর্যন্ত যানজট রয়েছে। এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন সাধারণত মানুষ। যানজটের কারণে কোরবানির পশুবাহী ট্রাক থেকে শুরু করে সব ধরনের পরিবহন রাস্তায় আটকে আছে। ঘণ্টা পার হয়ে গেলেও যানজট থেকে মুক্তি মিলছে না। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যানজটের পরিমাণ আরও বাড়ছে।

উত্তরা-টঙ্গী সড়কে আজও যানজট

এদিকে ঈদ সামনে রেখে রাজধানীর সড়কেও মানুষ আর গণপরিবহনের চলাচল অনেকটা বেড়ে গেছে। প্রাণঘাতী করোনাভাইরাস মহামারির আশঙ্কা আর ভয় যেন মানুষের কাছে একেবারেই উপেক্ষিত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের চাপে রাজধানী গাবতলী, সাভার, এয়ারপোর্ট, কাকলী, বনানী, বিশ্বরোড, খিলক্ষেত, সাইনবোর্ড, মাওয়া সড়ক, আব্দুল্লাহপুর এর আশপাশের সড়কসহ ও ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে যানজটের সৃষ্টি হয়েছে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো যাত্রী।

ঢাকা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক খন্দকার এনায়েত উল্ল্যাহ বলেন, সরকারের নির্দেশনা আমরা প্রতিপালন করব। তবে এর আগেও আমরা দেখেছি- গণপরিবহন বন্ধ থাকলেও যাত্রীরা বিকল্প পরিবহনে যাতায়াত করেছেন। এবারও তাই দেখতে হবে।

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার বলেন, ঈদকে সামনে রেখে নিরাপদ রেল ভ্রমণ উপহার দিতে আমরা পদক্ষেপ নিয়েছি। স্বাস্থ্যবিধি মানার নির্দেশনা রয়েছে মন্ত্রণালয়ের। আমরা সেটা মানছি। মানুষকে আমরা স্বাস্থ্যবিধি মানাতে পেরেছি।

গাজীপুরে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কে দীর্ঘ যানজট, ভোগান্তি | প্রথম আলো

বাংলাদেশ লঞ্চ মালিক সমিতির সহ-সভাপতি সাইদুর রহমান রিন্টু বলেন, আমরা কঠোরভাবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে লঞ্চ ছাড়ছি। স্বাস্থ্যবিধি মানতে সব লঞ্চ মালিকদের বলা হয়েছে। কোথাও অতিরিক্ত ভাড়া ও যাত্রী নেওয়া হচ্ছে না। আমরা এবার স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে কঠোর অবস্থানে আছি। তবে, নৌযানে শতভাগ স্বাস্থ্যবিধি মানানো অনেক কষ্টকর বিষয়।

বিআইডাব্লিউটিএ শিমুলিয়া নদী বন্দর কর্মকর্তা শাহাদাত হোসেন বলেন, ঈদকে কেন্দ্র করে মানুষের চাপ রয়েছে। নৌরুটে বর্তমানে ৮২টি লঞ্চ দিয়ে যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে। অপর দিকে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলগামী যাত্রী ও যানবাহনের চাপ বাড়ছে পাটুরিয়া ফেরি ঘাট এলাকায়। সকাল থেকেই যাত্রীবাহী পরিবহন ও ছোট গাড়ি ঘাট এলাকায় আসছে পর্যাপ্ত ফেরি থাকায় তবে পার হচ্ছে ঝামেলা ছাড়াই।

দলে দলে রাজধানী ছাড়ছে মানুষ (ভিডিও) - Bhorer Kagoj

বিআইডব্লিউটিসির পাটুরিয়া ঘাট শাখার বাণিজ্য বিভাগের সহকারী ব্যবস্থাপক মহিউদ্দিন রাসেল বলেন, সকাল থেকেই ছোট গাড়ির বেশ চাপ রয়েছে। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে যাত্রীবাহী পরিবহনের সারিও দীর্ঘ হচ্ছে। বর্তমানে পাটুরিয়া-দৌলতদিয়া নৌরুটে ১৬টি ফেরি দিয়ে যানবাহন ও যাত্রী পারাপার করা হচ্ছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।

বিডি প্রভাত/জেইচ