মানতা সম্প্রদায়ের নৌকাভাসী মানুষেরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, দাবী রাষ্ট্রের কাছে

মানতা সম্প্রদায়ের নৌকাভাসী মানুষেরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে চায়, দাবী রাষ্ট্রের কাছে

মু.হেলাল আহম্মেদ (রিপন), পটুয়াখালী: মানতা সম্প্রদায়ের মানুষজনের ‘নৌকা আমার জীবন ওরে, নৌকাতেই আমার মরন, তাইতো নদীর কূলে ভাসা, তুমিতো নও শুধুই নদী, তুমি আমার ভালবাসা, উপকূলের এক ভিন্নধর্মী জনগোষ্ঠী ‘মানতা’ সম্প্রদায় মানুষেরা।

জলে জন্ম, জলেই মৃত্যু, জলেই বসবাস।মৃত্যুর পর মরদেহ ভাসিয়ে দেয়া হয় নদী কিংবা সাগরে। বলছি মানতা সম্প্রদায়ের জীবনের কথা। অবিশ্বাষ্য হলেও আজ এ ঘাটে তো কাল অন্য ঘাটে। নেই কোন নির্দিষ্ট ঠিকানা নেই কোন স্থলে ঘড়বাড়ী। এদের জীবন নৌকার জীবন। স্ত্রী, সন্তান, স্বামী সবাইকে নিয়ে নৌকায় বসবাস। জন্ম,মৃত্যু,বিয়ে সবই নৌকার ছৈয়ের নিচে।নদী-খাল কিংবা সাগরে দেখা মেলে এদের। এমনকি ঝড়, বন্যা, তুফানেও নৌকাতেই তাদের বসবাস।

পটুয়াখালী জেলার রাঙাবালী উপজেলার বিছিন্ন একটি ইউনিয়ন চরমন্তাজ। চর মন্তাজের বিস্তীর্ণ অঞ্চলজুড়ে বাস করে এই মানতা সম্প্রদায়ের মানুষেরা।আমাদের দেশের প্রধানত উপকূলবর্তী জেলাগুলোর নদীর তীর ধরে হাঁটতে থাকলে দেখা মিলবে সারি সারি নৌকা। প্রতিটি নৌকাতে একটি করে পরিবার, মানতা সম্প্রদায়ের পরিবারের সমস্ত সুখ-দুঃখ, হাসি-কান্না মিশে আছে ঐ ছোট্ট নৌকাটি ঘিরে। এর বাইরে তাদের কোন বৃত্ত নেই। ধর্মে তারা মুসলমান, তবুও জীবন যাত্রা বিচিত্র ঢঙে তারা মানতা সম্প্রদায় নামে পূর্বে থেকেই পরিচিত।

এদের জীবিকার প্রধান উপায় মাছ ধরা। জাল, মাইজাল, বড়শি নিয়ে মাছ ধরে পুরুষেরা কেউবা পাখি স্বিকার করে দিন ভর। অন্যদিকে নারীরাও  এ কাজে কম পটু নন। একটু বয়স হলেই সন্তানেরাও মাছ ধরায় সাহায্য করে বাবা-মাকে।স্কুলে যাওয়া হয়ে ওঠে না বেশির ভাগেরই।পেটের খোড়াক রোজাগানোর তাগিদটা তাদেরও এতই বেশি যে ক্ষুধার কাছে বিদ্যার প্রসঙ্গ থেমে যায়। 

সম্প্রদায়টির বেশিরভাগই রয়েছে নাগরিকত্ব পরিচয়ের সঙ্কটে। সাম্প্রতিককালে সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে সম্প্রদায়টির একটি অংশ এলাকার বিভিন্ন আশ্রয়ণ প্রকল্পে মাথা গোঁজার ঠাঁই করে নিয়েছে সরকার । কিন্তু এতে কেবল আশ্রয়ই মিলেছে। মেলেনি অন্যান্য নাগরিক সুবিধা। বিশেষ করে শিক্ষা। আজও এ সম্প্রদায়টির শিশুদের বয়স ছয়-সাত-আটে পা দিলেই, জীবিকার তাগিদে হাতে তুলে নিতে হয় নৌকার বৈঠা। জাল ফেলতে হয় নদীতে। মাছ ধরায় ক্রমে হয়ে ওঠে দক্ষ। ফলে এরা বঞ্চিত হয় সাক্ষরজ্ঞান থেকে। শিক্ষা না থাকায় জীবনের পদে পদে হতে হয় বঞ্চিত-লাঞ্ছিত।

তাদেরও জন্ম নদীর বুকে, নদীতে বেড়ে ওঠা, নদীতেই মৃত্যু। আবার মৃত্যুর পর লাশগুলো তাই ভেসে যায় নদীর জলে। নয়তো নদীর তীরে গর্ত খুঁড়ে পুঁতে রাখা হয়। নদী কিংবা সমুদ্রের বুকে মাছ ধরার সব উপকরণ নিয়ে তারা ছুটে চলে জীবনের তাগিদে। নারী পুরুষ নির্বিশেষে তারা  মাছ ধরে।

পটুয়াখালীর জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে দেখা গেছে ওরা ভেসে চলে পানপট্টি, চরমনতাজ, গলাচিপা, কালাইয়া, বগা, বদনাতলী,চরকাজল, চিকনিকান্দি, উলানিয়া, দুমকী,সহ দক্ষিণাঞ্চলের বিভিন্ন নদী, চর ও মোহনাগুলোর তীরে এদের দেখা মেলে।

সরেজমিনে ৩ দিনের অনুসন্ধানে দেখা মেলে এই সম্প্রদায়ের কমপক্ষে পাঁচ শতাধিক পরিবার এ মৌসুম এলেই ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে পটুয়াখালীর বিভিন্ন উপজেলা ইউনিয়ন জুড়ে। 

এসময় কথা বলতে গেলে মানতারা জানান, দেশের নাগরিক হয়েও কোনো নাগরিক সুযোগ সুবিধা পাচ্ছি না আমরা। সরকার যদি আমাদের কোনরুপ পুনর্বাসনের সুযোগ করে দিত তাহলে আমরা স্বাভাবিক জীবন ফিরে পেতাম। শুধু তরুণ প্রজন্মই নয়, মানতাদের বৃদ্ধরাও অনেকে চান শেষ জীবনে অন্তত মাটির গন্ধে দিন মাটির স্পর্শে কাটাতে। মানতা সম্প্রদায়ের অনেকেই জানেন না তাদের পৈত্রিক ভিটে কোথায় ছিল, আদৌও ছিল কিনা।

যারা নিজেদের ইতিহাস জানেন, তারা বলছেন নদীভাঙন তাদের সবকিছু কেড়ে নিয়েছে। ফলে বাধ্য হয়েই এই নৌকার জীবন বেছে নিতে হয়েছে তাদের। 
এভাবেই আজ এখানে তো কাল ওখানে, ঘাট থেকে ঘাটে, জনপদ থেকে জনপদে ভেসে বেড়াচ্ছেন তারা। নৌকাতেই চলছে তাদের ঘরকন্না, হাসিকান্না, ঈদ-পার্বণ সব। এমনকি বিয়ে বা উৎসব তাও হয় নৌকাতেই।

আজ থেকে বিশ বছর আগে আলী সরদারের কন্যা রাবেয়া খাতুনের জন্ম। শৈশব, কৈশোর পার করে রাবেয়া বাপের নৌকা ছেড়ে এখন সংসার পেতেছে স্বামী বসারের নৌকায়।রাবেয়ার এক ছেলে, নাম রহিম। ডাল ভাতের আয়োজন দুপুরে। বিকেলে যদি মাছ ধরা পড়ে আর তা বিক্রির পর যদি কিছু বাচে, তবে রাতে মাছ রান্না হবে। ছেলে রহিম মাছ খেতে ভালোবাসে।

রাবেয়াকে যদি জিজ্ঞাসা করা হয়, আপনার ছেলে কি হবে ভবিষ্যতে? উল্টে বসে রাবেয়া।মুখখানা অন্য দিকে ঘুরিয়ে বলে, ‘জানি না। মানতা সম্প্রদায়ের মাছ ধরা পদ্ধতি। সাধারণ জেলেদের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন মানতাদের মাছ ধরার পদ্ধতি। ছোট ছোট জাল দিয়ে পোয়া, ইলিশ, পাঙ্গাস আর ছোট ছোট পোনা জাতীয় মাছ শিকার করেন তারা। চর মন্তাজের বিস্তীর্ণ নদীতে মাছ শিকার করে সেই মাছ আবার উপকূলের বিভিন্ন ঘাটে কম দামে বিক্রি করেন। তবে তারা গভীর নদীতে মাছ শিকারে যান না।

উপকূলের কাছকাছি থেকে মাছ শিকার করেন। মাছ শিকারে পুরুষদের মতো নারীরাও সমান পারদর্শী। অল্প বয়স থেকেই মানতা সন্তানেরা মাছ শিকারের কৌশল শিখে নেয়। বিভিন্ন প্রকৃতিক দুর্যোগ মোকাবেলা করে মাছ শিকারে সর্বদাই প্রস্তুত থাকে তারা। মানতা সম্প্রদায়ের নৌকাই জীবন। জম্মের পর থেকে নৌকার জীবন দেখে মানতা সম্প্রদায়ের শিশুরা। নৌকার ছাউনি থেকে উঁকি মেরে দেখে বিশাল আকাশ আর নিচে অথৈ জলরাশি। এই নৌকাতেই তারা বেড়ে ওঠে।

নৌকাতেই তাদের রান্না, খাওয়া-দাওয়া, নৌকাতে ঘুম, নৌকাতে বিয়ে, নৌকাতেই ঈদ, নৌকাতেই সব। পরিবারের সদস্য বেশি থাকলে দুই বিছানা তৈরি করা হয়। সেখানেই রাত্রিযাপন। মানতাদের মধ্যে পারস্পরিক ঐক্য প্রবল। যেকোনো হামলা ও বিপদ তারা একত্রে প্রতিহত করেন। একে অপরের প্রতি তাদের হিংসা-বিদ্বেষ নেই বললেই চলে। মানতাদের প্রতি বহরেই রয়েছে একজন সর্দার। তিনিই নিজেদের মধ্যে ছোট বড় সব ঝামেলা নিষ্পত্তি করেন। তবে বড় ধরনের অপরাধ হলে তা থানা পর্যন্ত গড়ায়। ইদানীং মানতা যুবকদের দু একজন মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। এছাড়া খবরা খবর জানতে নৌকা বহরে দু একটি রেডিওর দেখা মেলে।

মানতা সম্প্রদায়ের বিয়ে পদ্ধতি- মানতাদের একেকটি বহরে ৪০-৮০টি নৌকা থাকে। একযোগে এরা এক স্থান থেকে অন্য স্থানে যায়। প্রতিটি বহরের সদস্যরা একে অপরের আত্মীয়। এদের বিয়ে হয় আত্মীয়দের মধ্যেই। এক নৌকা থেকে অন্য নৌকার কারও সঙ্গে। মানতা সম্প্রদায় লোকেরা ইসলামী রীতিতে কাজী ডেকে এনে বিয়ে পড়ায়। আর্থিকভাবে একটু স্বচ্ছল পরিবারের সদস্যরা সাউন্ড বক্স, মাইক বাজিয়ে নাচ-গান করে বিয়ে উৎসব পালন করেন। এ ক্ষেত্রে নৌকা বহরের সকল সদস্য দাওয়াত পান।

বিয়ের দিন সবার মাছ শিকার বন্ধ থাকে। মানতাদের বিয়েতে যৌতুক প্রথা নেই তবে মেয়ে জামাইকে কেউ কেউ খুশি হয়ে পূর্নবাসনের ব্যবস্থা করেন।কিছুদিন ধরে প্রচলিত নিয়ম পাল্টানোর চেষ্টা করছে মানতাদের অনেকেই। তবে মানতাদের বহরের নৌকায় ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দিতে চান না। অন্য বহরে বিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা তাদের ুএমনটাই প্রকাশ করেন তারা।

মানতা সম্প্রদায়ের স্বাস্থ্য চিত্র- এরা বেড়ে ওঠে অস্বাস্থ্যকর নোংরা পরিবেশেই।নৌকাতে জীবন কাটানোর ফলে এরা স্বাভাবিক পরিবেশ পায়না। ছোট ছোট শিশুরা ভোগে নানা অপুষ্টিজনিত বিভিন্ন রোগে।বয়স্কদের রোগ বালাই নেই বললেই চলে। নৌকাতেই গর্ভবতী নারীরা সন্তান প্রসব করেন। জটিল সমস্যা হলে হাসপাতালে যেতে হয়। অনেক প্রসূতি নারীই আবার হাসপাতালে যেতে চাননা।

ফলে সন্তান জন্ম দিতে গিয়ে মায়ের মৃত্যুর ঘটনা ঘটে হরহামেশাই। মানতা সম্প্রদায়ের অনিশ্চিত জীবন। মানতাদের জীবন চরম অনিরাপদ। নদীতে অহরাত্রি তাদের দস্যুর ভয়ে কাটাতে হয়। যখন উপকূলের কাছাকাছি থাকেন তখন আবার চোর-ডাকাতদের ভয়। ঝড়-জলোচ্ছাসের সময় এরা পায়না কোনো সতর্কতা সংকেত। তাই দুর্যোগের মধ্যেও তাদের থাকতে হয় নদীতে।

মানতা সম্প্রদায়ের পড়াশোনা- নতুন প্রজন্মের কারও কারও সামান্য অক্ষরজ্ঞান থাকলেও বাকিরা সবাই অক্ষরজ্ঞানহীন বলাচলে মানতা সম্প্রদায়ের প্রায় সবাই অশিক্ষিত। মূলত নদীতে ভাসমান জীবন কাটানোর ফলে মানতাদের পড়াশোনা করা হয়ে ওঠেনা। এছাড়া নিত্য অভাব আর টানাপোড়েনও তাদের শিক্ষার অন্তরায়। আধুনিক সভ্যতা থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন এসব মানুষ যুগ যুগ ধরে বাস করছেন নৌকাতে। বাপ-দাদার পেশা নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে চলছে এদের দিন। অনেকটা নির্বাসন দণ্ডের মতো জীবন কাটছে এদের।

এক সময় এ জীবনে প্রাচুর্য্য ও সুখ থাকলেও এখন আর সেই সুদিন নেই।ডাঙায় নিজেদের জমি-জমা না থাকায় স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে পারছেন না তারা।তবুও অধীর প্রতীক্ষা নিয়ে তারা চেয়ে আছেন সরকারি পদক্ষেপের আশায়। তাদের চাওয়া সরকারিভাবে পুনর্বাসনের মাধ্যমে তাদের এই নৌকার জীবন থেকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাওয়ার সুযোগ করে দেওয়া হোক। তৈরি করে দেওয়া হোক মাথা গোঁজার ঠাই। এতটুকুই মানতাদের প্রানের দাবী।

পটুয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান বলেন, মানতা সম্প্রদায় চাইলে তাদের স্বাভাবিক জীবন নিশ্চিতে সব নাগরিক সুবিধা দেয়ার কথা। অন্যদিকে  শিশুদের শিক্ষার ব্যাপারেও আন্তরিকতা আছে বলে জানালেন পটুয়াখালী জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা।

বিডি প্রভাত/জেইচ