বিপন্ন প্রজাতির নিঃসঙ্গ মর্মর বিড়ালের কাহিনী

বিপন্ন প্রজাতির নিঃসঙ্গ মর্মর বিড়ালের কাহিনী

মো. জুনেদ আহমদ, শ্রীমঙ্গল: বিশ্বে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকা প্রাণীদের মধ্যে রয়েছে মর্মর বিড়াল; যার একটি রয়েছে মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলে।শনিবার সকালে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে গিয়ে এর পরিচালক সিতেশ রঞ্জন দেবের কাছে জানা গেল এ মর্মর বিড়ালের কাহিনী।

সিতেশ রঞ্জন দেব জানান, ২০১৪ সালের শ্রীমঙ্গল নিরালা পুঞ্জিতে খাসিয়া সম্প্রদায়ের এক যুবকের কাছ থেকে বিড়াল ছানাটি সংগ্রহ করেন তিনি। তখনও এর চোখও ফোটেনি। দুই-তিন দিনের বাচ্চা হবে।

এটিকে প্রথমে সোনালী বিড়ালের ছানা ভেবেছিলেন তিনি। খোঁজ করতে গিয়ে জানতে পারেন ছানাটির মা মারা গেছে। ছানাটিকে তার বাসায় এনে প্রথমে ড্রপারে পরে ফিডারে দুধ খাওয়াতে থাকেন। সে সময় ছানাটির যত্ন নিতেন তার দুই মেয়ে। খুব যত্নে বড় করতে থাকেন তারা। পরম আদরে বড় হতে হতে তাদের বাসার সদস্যই হয়ে এটি বলেন এই প্রাণী প্রেমিক।

তিনি বলেন, প্রথমে এটি মেছোবাঘ বা বিড়ালের মত ফেত ফেত শব্দ করত। কিছুদিন পর গৃহপালিত বিড়ালের মতই মিঞাও বলে ডাকতে শুরু করে। তখন তার ধারণা হয় হয়তো এটি শংকর প্রজাতির বিড়াল। তবে প্রাণী গবেষক শরিফ খান শ্রীমঙ্গলে বেড়াতে এসে নিশ্চিত করেন এ বিড়াল মর্মর প্রজাতির। যার ইংরেজি নাম মার্বেলড ক্যাট আর বৈজ্ঞানিক নাম Pardofelis Marmorata।

বন্যপ্রাণী গবেষক শরীফ খান বলেন, স্বাধীনতার পর দেশে জীবিত মর্মর বিড়াল পাওয়া যায়নি। তবে পাহাড়ে এর চামড়া পাওয়ায় ধারণা হয়েছিল এটির অস্তিত্ব দেশের পার্বত্য এলাকায় রয়েছে। অনেকে মনে করতেন, হয়তো এটি দেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। সিতেশ বাবুর প্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনে এটি দেখে রীতিমতো প্রাণী গবেষকদের মধ্যে হইচই লেগে যায়। প্রাণীটি খোদ সিতেশ রঞ্জন দেবের কাছেও অজানা ছিল।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, এক সময় সিলেট অঞ্চলে এ প্রাণীকে প্রায়ই দেখা যেত। তাই কেউ কেউ এটিকে ছোট পাখি খাওড়া’ নামেও ডাকত। সিতেশ রঞ্জন দেবের ছেলে সজল দেব বলেন, তাদের সেবা ফাউন্ডেশনে থাকা বিড়ালটি পুরুষ। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বংশ বিস্তারের জন্য একটি মাদি সঙ্গী সন্ধান করেও পাননি তারা।

প্রাণীটি বনের ছোট পাখি, পাখির ডিম ও বাচ্চা, বুনো খরগোশ, বড় ইঁদুর এবং ব্যাঙ খেয়ে থাকে। তবে এ মর্মর বিড়ালকে তারা বেশিরভাগ সময় কোয়েল পাখি ও মুরগি খেতে দেন।

সিতেশের মেজ ছেলে সঞ্জিত দেব জানান, ৭ বছর ধরে বিড়ালটি লালন-পালন করছেন তারা। শিকার ধরতেও বেশ পটু, দূর থেকে কোয়েল পাখি ছুড়ে দিলে লাফিয়েও ধরে ফেলে। এখনও কাউকে কামড় না দিলেও এটির কাছে গেলে আত্মরক্ষার চেষ্টা চালায়। তাই দূর থেকেই এটিকে পাইপ দিয়ে গোসল করাতে হয় বলেন তিনি।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের সভাপতি ড. মনিরুল এইচ খান জানান, সিলেট, ময়মনসিংহ এবং পার্বত্য চট্টগ্রামের বনে মর্মর বিড়ালের বিচরণ রয়েছে। সিতেশ দেবের কাছে থাকা বিড়ালটি সিলেটের বনে এ প্রজাতির অস্তিত্বের বাস্তব প্রমাণ।

তিনি জানান, পরিণত মর্মর বিড়াল নাকের ডগা থেকে লেজ পর্যন্ত তিন থেকে সাড়ে তিন ফুট লম্বা হয়ে থাকে। এদের গড় আয়ু প্রায় ১২ বছর।
নিশাচর গোছের এ প্রাণী গাছে থাকতেই ভালোবাসে। খাবারের সন্ধানে অনেক সময় মাটিতে নেমে আসে। বুনো খরগোশ, বড় ইঁদুর, ব্যাঙ ইত্যাদিও ধরে খায়। একটি মা মর্মর বিড়াল এক সঙ্গে এক থেকে চারটি ছানা জন্ম দিয়ে থাকে।

বাংলাদেশ ছাড়া ভারতের ত্রিপুরা, আসাম, মণিপুর, মেঘালয়সহ পাহাড়ি অঞ্চলে এবং মিয়ানমার, নেপাল, ভিয়েতনাম, লাওস, কম্বোডিয়া, চীন, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়ায় মর্মর বিড়ালের বাস রয়েছে। এ প্রজাতির বিড়াল বিলুপ্তির ঝুঁকিতে থাকায় প্রকৃতি সংরক্ষণ বিষয়ক আন্তর্জাতিক ইউনিয়ন (আইইউসিএন) এটি শিকার নিষিদ্ধ করেছে বলে জানান তিনি।

বিডি প্রভাত/জেইচ