পোড়া লাশের গন্ধে স্বজনের আর্তনাদ

পোড়া লাশের গন্ধে স্বজনের আর্তনাদ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে রূপগঞ্জের (নারায়ণগঞ্জ) কর্ণগোপ এলাকার সেজান জুস ফ্যাক্টরি নামে পরিচিত হাশেম ফুডস্ এন্ড বেভারেজ কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

বৃহস্পতিবার বিকালে এই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। ভবনটিতে প্রচুর দাহ্য পদার্থের উপস্থিতিতে নেভানোর পরও ফের জ্বলে উঠছিল আগুন। ভবনে ভয়াবহ আগুনে পুড়ে লাশ হয়েছে ৫২ তাজা প্রাণ। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে ২৫ জনকে। 

এতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিট সম্মিলিত প্রচেষ্টায় ২২ ঘণ্টা পর শুক্রবার সন্ধ্যায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে। এদিন রাত পৌনে ১২টায় উদ্ধার কাজ স্থগিত করা হয়। প্রয়োজনে আজ ফের উদ্ধার কাজ পরিচালনা করা হবে। এ ঘটনায় বেশ কিছু শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন বলে স্বজনদের দাবি। 

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, ফ্যাক্টরির ছয়তলা বিশিষ্ট ভবনের তৃতীয় তলা থেকে গ্যাস লাইন লিকেজ কিংবা বিদ্যুতের শর্টসার্কিট থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। মুহুর্তেই আগুনের লেলিহান শিখা ভবনের সকল ফ্লোরে ছড়িয়ে পড়ে। আগুনে ফ্যাক্টরির কাঁচামাল, উৎপাদিত পণ্য ও মূল্যবান সামগ্রীসহ বিপুল পরিমাণ টাকার ক্ষয়ক্ষতি হয়।

No description available.

খবর পেয়ে কাঞ্চন, পূর্বাচল, ডেমরা, আড়াইহাজার, আদমজী ফায়ার সার্ভিসের ১৭ ইউনিটের কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। আগুনে ভবনের বিভিন্ন তলায় ফ্যাক্টরির কর্মচারী ও কর্মকর্তারা আটকা পড়ে। কেউ কেউ লাফিয়ে নিচে পড়ে আহত হয়। আহতদের বিভিন্ন হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। এ সময় মহাসড়কের উভয়পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। এছাড়া আগুনে নিহতের ঘটনায় আতংকিত হয়ে শ্রমিকরা দ্বিকবিদিক ছুটোছুটি করে আহত হয়।

অন্যদিকে, নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজন ও প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় ছয়তলা ভবনের চারতলার শ্রমিকরা কেউ বের হতে পারেননি। সিকিউরিটি ইনচার্জ চারতলার কেচি গেটটি বন্ধ করে রাখায় কোনো শ্রমিকই বের হতে পারেনি। প্রতিদিন ৪ তলায় ৭০-৮০ জন শ্রমিক কাজ করতেন। চতুর্থ তলার শ্রমিকদের ইনচার্জ মাহবুব, সুফিয়া, তাকিয়া, আমেনা, রহিমা, রিপন, কম্পা রানী, নাজমুল, মাহমুদ, ওমরিতা, তাছলিমাসহ প্রায় ৭০-৮০ জন শ্রমিকের খবর পাওয়া যাচ্ছে না। 

স্বজনরা অভিযোগ করে জানান, কারখানা কর্তৃপক্ষের অবহেলায় কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তাছাড়া কারখানায় আগুন লাগার পরও কারখানা কর্তৃপক্ষ কেচি গেটের তালা না খোলায় শ্রমিকরা বের হতে পারেননি।

আগুনের লেলিহান শিখায় পুড়ে ছাই হয়ে গেছে সব। কারখানার ভেতর থেকে একের পর এক বের করে আনা হয় আগুনে পুড়ে অঙ্গার হওয়া লাশ। সেখানকার বাতাসে ভাসতে থাকে পোড়া লাশের উৎকট গন্ধ। ভবনের কলাপসিবল গেট তালাবদ্ধ থাকায় বাড়ে হতাহতের সংখ্যা। অ্যাম্বুলেন্সে করে লাশগুলো নিয়ে আসা হয় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে।

No description available.

আহত, নিহত ও নিখোঁজ ব্যক্তির স্বজনদের কান্নায় ভারি হয়ে ওঠে কারখানা ও ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এলাকা। বিক্ষুব্ধ শ্রমিক ও স্বজনদের একটি অংশ আগুন নেভানোয় দেরির অভিযোগ এনে ভাঙচুর করেন কারখানাটির পাশের একটি ভবন ও কয়েকটি গাড়ি। বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।

এ সময় আনসার সদস্যদের শটগান ছিনিয়ে নিয়ে পার্শ্ববর্তী পুকুরে ফেলে দেন তারা। এদিকে ঘটনায় গভীর শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছেন রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। নিহতদের মধ্যে তিনজনের পরিচয় পাওয়া গেছে। পুড়ে বিকৃত হয়ে যাওয়ার কারণে অন্য লাশগুলো শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।

নির্ভরযোগ্য দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে, রূপগঞ্জের ঘটনাস্থলের ধ্বংসস্তূপ থেকে আনা ৪৮টি লাশের ময়নাতদন্ত শুক্রবার রাতে সম্পন্ন হয়। ঢাকা মেডিকেল কলেজ ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ মাকসুদের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি টিম ময়নাতদন্তে অংশগ্রহণ করেন।

আরও দুজন হলেন প্রভাষক ডা. প্রদীপ বিশ্বাস ও দেবিকা রায়। ময়নাতদন্ত কার্য়ক্রমে তিনজন অংশগ্রহণ করলেও এটি মেডিকেল বোর্ড গঠন করে করা হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য জানাতে পারেননি।

No description available.

সূত্র জানায়, নারায়নগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের মোড়ানো লাশের প্যাকেটগুলো একে একে খুলে ময়নাতদন্তকালে ফরেনসিক মেডিসিন চিকিৎসক ও অন্যান্য ময়নাতদন্তকারী সহায়করা রীতিমতো আঁতকে ওঠেন। একটি লাশও দেখে চেনার উপায় নেই। প্রতিটি লাশ ভয়াবহভাবে পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে।

পরিচয় খুঁজে বের করার জন্য লাশ থেকে নমুনা হিসেবে প্রত্যেকের বুকের পাঁজর সংগ্রহ করা হয়। তবে ভিন্ন একটি সূত্র জানায়, হাতে গোনা দুই থেকে তিনটি লাশ থেকে ডিএনএর নমুনা হিসেবে মাসল (মাংসপেশির নমুনা) থেকে নমুনা সংগ্রহ করা হয়।

ময়নাতদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চাইলে ঢামেক হাসপাতালের ফরেনসিক মেডিসিন বিভাগের প্রধান ডা. মোহাম্মদ মাকসুদ বলেন, ৪৮টি লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়েছে। লাশগুলো দেখে চেনার উপায় নেই। তারা ডিএনএ নমুনা হিসেবে লাশগুলোর পাঁজর (রিভ) সংরক্ষণ করা হয়েছে।

এদিকে অগ্নিকাণ্ডের পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। কারখানা থেকে লাশ বের করার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল পড়ে যাচ্ছে।এ যেন বাতাসে বাতাসে কান্নার ধ্বনি

রূপগঞ্জে অগ্নিকাণ্ডে শ্রমিক নিহতের ঘটনায় সামাজিক মাধ্যমে শোক

কেউ কাঁদছেন সন্তানকে হারিয়ে, আবার কেউ আহাজারি করছেন মা-বাবাকে হারিয়ে। বেঁচে নেই নিশ্চিত হয়েও শুধু প্রিয়জনের দেহাবশেষের ছুঁয়ে দেখতে বুক চাপরাচ্ছেন কেউ কেউ।

বাবা খুঁজছে মেয়ে, মেয়ে খুঁজছে মা, স্বামী স্ত্রীকে। এক ভয়াবহ শোকের রুপ ধারণ হয়েছিলো। কম্পা রানী বর্মণ। ছয়দিন আগে তিনি যোগ দেন নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায়। বৃহস্পতিবারের ভয়াবহ আগুনের পর তার আর খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। তাই মেয়েকে খুঁজতে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে এসেছেন বাবা পরভা চন্দ্র বর্মণ।

ঘটনার দিন একই কারখানার দ্বিতীয় তলায় কাজ করছিলেন চম্পা খাতুন। তার মা মিনা খাতুন কাজ করছিলেন চতুর্থ তলায়। অগ্নিকাণ্ডের আগে চম্পা তার কাজে নিচে নেমে যান। মা তখন ছিলেন চতুর্থ তলায়। আগুন লাগার পর আর মায়ের দেখা পাননি চম্পা। তাই মায়ের খোঁজে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে এসেছেন তিনিও।

অসুস্থ স্বামী কাজ করতে পারেন না এ কারণে সংসারের হাল ধরতে তিন মাস আগে এই কারখানাটিতে কাজ নেন ফিরোজা বেগম। কারখানাটিতে আগুন লাগার পর তিনিও নিখোঁজ। তাই স্ত্রীর সন্ধানে ঢাকা মেডিকেলের মর্গে ছুটে এসেছেন স্বামী মো. জাহিদ।

মর্গের বাইরে শুধু স্বজন হারানোর কান্না- লাশ পোড়া কটু গন্ধ, ৫২টা প্রাণ  হারিয়ে শোকে বোবা বাংলাদেশ | The cry of losing relatives outside the morgue  of Dhaka Medical College ...

পরভা চন্দ্র বর্মণ, চম্পা খাতুন, মো. জাহিদের মতো অনেকেই স্বজনদের খোঁজে ছুটে এসেছেন ঢাকা মেডিকেলের মর্গে। তাদের কারও মেয়ে, কারও মা, কারও ভাগ্নে, কারও আবার দূরসম্পর্কের আত্মীয় অগ্নিকাণ্ডের পর নিখোঁজ রয়েছেন।

কারখানার সামনে কথা হয় কিশোরগঞ্জের বাচ্চু মিয়ার সঙ্গে। তাঁর মেয়ে তাসলিমা আক্তার (১৮) আগুনের ঘটনায় এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।

তিনি বলেন, আমার মেয়ে ও আমার স্ত্রী গত এক বছর ধরে কারখানাটিতে কাজ করে। গতকাল (বৃহস্পতিবার) সকাল ৮টার দিকে তারা কারখানাটিতে কাজে যায়। রাত ৮টায় তাদের শিফট শেষ হওয়ার কথা ছিল। আমার স্ত্রী কারখানার দোতলায় কাজ করত। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে সে দোতলা থেকে লাফ দিয়ে নিচে নেমে আসে। সামান্য আহত হলেও সে প্রাণে বেঁচে যায়।

সে আমাকে ফোন করে জানায়, আমাদের মেয়ে কারখানার চারতলায় কাজ করে, সে বেরোতে পারেনি। ‌কারখানার লোকজনের কাছে আমার স্ত্রী শুনেছে, চারতলার গেট আটকা থাকায় ভেতরের কেউ বের হতে পারছে না।

কাঁদছে রূপগঞ্জ

তিনি বলেন, খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসি। এখানে থাকা শ্রমিকরা আমাকে জানান, চারতলার শিফট ইনচার্জ গেট বন্ধ করে দেয় এবং ভেতরে থাকা শ্রমিকদের বলে, নিচতলায় আগুন লেগেছে, আগুন নিভে যাবে; তোমাদের কোনো সমস্যা নেই। তোমাদের বের হতে হবে না।

শুক্রবার (৯ জুলাই) বিকেলে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‍্যাব) মহাপরিচালক আব্দুলাহ আল মামুন। তিনি বলেন, রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফুডস ফ্যাক্টরিতে আগুনের ঘটনা তদন্ত করা হবে। তদন্তে এ ঘটনার জন্য দায়ী হিসেবে যাদের নাম বেরিয়ে আসবে তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না

শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী বেগম মন্নুজান সুফিয়ান বলেছেন, যদি শিশুদের শ্রমিক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে অবশ্যই আমরা ব্যবস্থা গ্রহণ করব।

প্রতিমন্ত্রী বলেন, এখানে শিশু শ্রমিক কাজ করেছে, এমন কোনো তথ্য আমরা এখনো পাইনি। ১৮ বছরের নিচে কোনো শিশু এখানে কাজ করেছে কি না তা এখনো জানা যায়নি। আমাদের একটি টিম এখানে কাজ করছে, তারাও এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে কিছু জানাতে পারেনি।

মর্গে পোড়া লাশের গন্ধ, বাইরে স্বজনদের আহাজারি | NTV Online

তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা তদন্তে আমরা একটি কমিটি গঠন করেছি। আমরা হাসপাতালে যাদের দেখে এসেছি, যারা চিকিৎসা নিচ্ছে তাদের প্রত্যককে ৫০ হাজার টাকা করে আর্থিক সহযোগিতা দেবো। আর যারা মারা গেছেন তাদের পরিবারকে ২ লাখ টাকা করে অনুদান দেওয়া হবে। অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় এই প্রতিষ্ঠানের মালিকের কাছ থেকেও শ্রমিকদের জন্য ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা আমরা করব।

নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জের সেজান জুসের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় শোক প্রকাশ করেছেন মন্ত্রিসভার সদস্যরা। শুক্রবার (৯ জুলাই) আলাদা শোকবার্তায় মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রীরা শোক প্রকাশ করেছেন। শোকবার্তায় তারা নিহতদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করেছেন এবং শোকাহত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানিয়েছেন। অন্যদিকে অগ্নিকাণ্ডে হতাহতের ঘটনায় বিভিন্ন সংগঠন শোক জানিয়েছে। একই সঙ্গে অনেক সংগঠন ক্ষোভও জানিয়েছে। 

রূপগঞ্জ ট্র্যাজেডি: কারখানার পঞ্চম ও ষষ্ঠ তলায় উদ্ধার অভিযান শুরু -  DesheBideshe

সেজান জুসের কারখানা লাগা আগুনে ৫২ জন শ্রমিক নিহতের ঘটনায় দোষীদের গ্রেফতার দাবি জানিয়েছে গ্রিন বাংলা গার্মেন্টস ওয়ার্কার ফেডারেশন।সংগঠনটি হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের মালিকানাধীন সেজান জুস কারখানার অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জন শ্রমিক নিহতের ঘটনায় দোষীদের দ্রুত গ্রেফতার, নিহত শ্রমিকের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করা, নিহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের আইএলও কনভেনশন ১২১ অনুযায়ী ক্ষতিপূরণ এবং আহত ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের জন্য জরুরি সহায়তা, বিনামূল্যে চিকিৎসা এবং যথাযথ ক্ষতিপূরণ দাবি করেছে।

বিডি প্রভাত/জেইচ