পেকুয়ায় আ’লীগ নেতা-কর্মীর জমিতে এমপি’র বাণিজ্যিক ভবন

পেকুয়ায় আ'লীগ নেতা-কর্মীর জমিতে এমপি'র বাণিজ্যিক ভবন

পেকুয়া সংবাদদাতা: কক্সবাজারের পেকুয়ায় কবির আহমদ চৌধুরী বাজারে চলমান নিউ মার্কেট নির্মাণ নিয়ে চলছে চরম উত্তেজনা। বিতর্কিত জমিতে বহুতল বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণকে কেন্দ্র করে চকরিয়া-পেকুয়ার সাংসদ জাফর আলম ও ক্ষমতাসীন দল আ’লীগের স্থানীয় নেতা-কর্মীদের মধ্যে দ্বন্ধ প্রকট আকার ধারণ করেছে।

স্থাপনা নির্মাণকাজ বন্ধ রাখতে ও কাজ চলমানকে ঘিরে সাংসদের অনুগত লোকজন ও আ’লীগের একটি অংশের মধ্যে উত্তেজনা চলছে। গত এক মাসের ব্যবধানে একাধিকবার দ্বন্ধের সুত্রপাত হয়েছে।

তবে স্থানীয়রা জানান, এ সব কিছু অবজ্ঞা করে সাংসদ জাফর আলম ও তার পক্ষের অংশীদাররা নিউ মার্কেট নির্মাণকাজ অব্যাহত রাখেন। জায়গা নিয়ে আদালতে মামলা বিচারাধীন। নি:স্বত্তবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমি রেজিস্ট্রি নেওয়া হয়েছে। ওই দলিলের ভিত্তিতে নিউ মার্কেট নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন হচ্ছে।

রিয়েলিটি নামে একটি নির্মাণ প্রতিষ্টানের সঙ্গে সাংসদ জাফরএমপিসহ আরো কয়েকজন অংশীদারদের মধ্যে চুক্তি হয়েছে। ওই চুক্তির ভিত্তিতে পেকুয়ায় কবির আহমদ চৌধুরী বাজারে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন নিউ মার্কেট নির্মাণকাজ। তবে জমির মালিকানা ও দলিলের বৈধতা নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। জমির জবর দখল ঠেকাতে ২০১৫ সালে কক্সবাজারের যুগ্ম জেলা জজ আদালতে অপর মামলা রুজু হয়েছে। যার নং ১২৪/১৫।

সম্প্রতি বিরোধপূর্ন ওই জায়গা নিয়ে পেকুয়ায় আধিপত্যবাদ বিরাজ করছে। আদালতে মামলা থাকার পরেও কাজ চলমান থাকায় ৫টি সম্পূরক পিটিশন বিচারিক আদালতে প্রেরিত হয়েছে। আদালত সেই সব সম্পূরক পিটিশন শুনানীতে অন্তর্ভূক্তি হিসেবে গণ্য করে। বিরোধীয় জমির রুপ ও শ্রেনী পরিবর্তনের প্রচেষ্টা চলছে। এমন অভিযোগের ভিত্তিতে বিজ্ঞ বিচারিক আদালত এডভোকেট কমিশনকে সরেজমিনে পাঠান।

গত ৩০ জুন বিকেলে বিজ্ঞ যুগ্ম জেলা জজ ২য় আদালত থেকে পাঠানো উকিল কমিশনের একটি প্রতিনিধি টীম পেকুয়ায় পরিদর্শন করেছেন। বাদীর পক্ষে দেওয়ানী কার্যবিধির এক আদেশের ১০(২) নিয়ম ও ১৫১ ধারামতে আর্জিসমূহ মামলার পক্ষভূক্ত করার আদেশ রয়েছে। ওই দিন উকিল কমিশনকে স্বাক্ষ্য দিতে প্রায় ২শতাধিক লোকজন এ সময় উপস্থিত থেকে নিজ নিজ বক্তব্য উপস্থাপন করেন।

তারা জানান, এ জমি আমাদের বাপ দাদার সম্পত্তি। তবে ওয়ারিশদের মধ্যে আমরা অনেকে ওই জমির ক্ষমতা অর্পণনামায় স্বাক্ষর করেছি। ২০১৪ সালের দিকে এ জমি আমরা ফরিদুল আলম গংদের অনুকুলে রেজিষ্ট্রার্ড আমমোক্তারনামা সম্পাদন করি। কথা ছিল আমাদের কাছ থেকে জমি রেজিষ্ট্রি নিয়ে এর উন্নয়ন ও অবকাঠামো নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করা হবে।

কিন্তু সাংসদ জাফর আলম আমাদের জমিতে এসে মার্কেট নির্মাণকাজ আরম্ভ করে। তিনি সাংসদের ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে জমি জবর দখল করছেন। এ দিকে পেকুয়া বাজারের নির্মাণাধীন নিউ মার্কেটের ভূমির মালিকানা ও আধিপত্য নিয়ে স্থানীয় সাংসদ জাফর আলম ও আ’লীগের নেতা-কর্মীদের মধ্যে বিরোধ প্রকট আকার ধারণ করেছে।

সুত্র জানায়, ২০০৯ সাল থেকে ওই জায়গা নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের দুটি অংশের মধ্যে বিরোধ চলমান আছে। ২০১০ সালের দিকে যুবলীগ সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ও উপজেলা আ’লীগের বর্তমান সাধারন সম্পাদক আবুল কাশেম গংদের মধ্যে বিরোধ চলছিল। সেই সময় জায়গাটির আধিপত্য নিতে উভয়পক্ষের মধ্যে একাধিকবার সংঘর্ষ হয়েছিল। ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়াকে কেন্দ্র করে আ’লীগের রাজনীতি পেকুয়ায় চরম প্রশ্নবিদ্ধ ছিল। সেই সময় ওই জায়গা থেকে জাহাঙ্গীর আলমকে হটিয়ে দেওয়া হয়।

এরপর জেলা আ’লীগ সদস্য এস,এম গিয়াস উদ্দিন আ’লীগ নেতা আবুল কাশেমসহ ক্ষমতাসীন দলের ১০ জনের নামে আমমোক্তারনামা সৃজিত হয়। ওই আমমোক্তারনামায় চকরিয়া উপজেলা আ’লীগের সভাপতি জাফর আলমকেও গ্রহীতা হিসেবে যুক্ত করা হয়েছিল। ৫/৬ বছর বিরোধীয় জায়গাটি খিলা ছিল। জাফর আলম সাংসদ নির্বাচিত হওয়ার পর জায়গাটি নিয়ে ফের দৃষ্টি দেন।

তবে তার সঙ্গে আমমোক্তারনামা গ্রহীতাদের এড়িয়ে যান। তিনি কিছু ব্যক্তিদের কাছ থেকে জমি রেজিষ্ট্রি নেন। সাংসদ ছাড়াও তার মেয়ে তানিয়া আফরিনকেও জায়গার মালিক করেন। এ ছাড়া তার অনুগত কয়েকজনের নামেও উক্ত স্থান থেকে জায়গা খরিদ করেন।

আ’লীগের নেতারা জানান, সাংসদ আমাদের সাথে আমমোক্তারনামায় শর্ত ভঙ্গ করেন। ৫/৬ জন অনুপ্রবেশকারীকে নিয়ে তিনি নি:স্বত্তবান ব্যক্তিদের কাছ থেকে দলিল নিয়েছেন। ওই দলিল নিষ্ক্রিয়। আমরা উকিল মতামত নিয়েছি। এর মধ্যে ১০ টি দলিলকে অকার্যকর দলিল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ৪ নং ওয়ার্ড আ’লীগের সাবেক সভাপতি ফরিদুল আলম জানান, এ জমি আমার বাপ দাদার সম্পত্তি। এখানে আমাদের দোকান ছিল। বাড়িও ছিল। আমরা বাসা ভাড়া দিতাম। এমপি আমাদের কাছ থেকে রেজিষ্ট্রি নেননি। আমরা আইনী পদক্ষেপ নিচ্ছি।

সদর ৪ নং ওয়ার্ড আ’লীগের সভাপতি দিদারুল ইসলাম জানান, এখানে আমাদের জায়গা জমি আছে। এমপি সাহেবের কোন জায়গা জমি নেই। তিনি যে সব ব্যক্তিদের কাছ থেকে কবলা নিয়েছেন তারা ১৯৬৪ ইং সনে চট্টগ্রামের মহাকুমা ডিসির নিকট সরকার বরাবর হস্তান্তর করেছেন। এরপর একই জমি তাদের ওলি ওয়ারিশরা বিক্রি করেছেন। তথ্য গোপন করে ৪/৫ দফা রেজিষ্ট্রি হয়েছে।

নি:স্বত্তবান ব্যক্তিরা ওই জমি আবার এমপিকে বিক্রি করে। কিছু বৈধ মালিক পাওয়ার অব এটর্নি দিয়েছে। সেখানে এমপিসহ পেকুয়ার আ’লীগ নেতারা ছিলেন। এখন ওই আমমোক্তারনামা কার্যকর না করে এমপি জমিতে গেছেন। এটি শর্তভঙ্গের সামিল। আমরা আদালতে আমমোক্তারনামা থেকে এমপিসহ শর্তভঙ্গকারীদের নাম কর্তনের আবেদন করেছি।

খরিদ ও ওয়ারিশসুত্রে মালিক বদরুজ্জামান জানান, এখানে এমপির কোন জায়গা নেই। তিনি মার্কেট নির্মাণ করছেন কলাপাতা নিয়ে। সব দলিল ও দস্তাবেজ আমার হাতে রয়েছে। ইনশাআল্লাহ নিউ মার্কেট ও ইম্পালস নিউ মার্কেট নির্মাণ কাজ নিশ্চয়ই বন্ধ করা হবে। জায়গার মালিক দলিল দস্তাবেজ। ক্ষমতা ও গায়ের জোরে কারো জমি দখল করার এ সুযোগ শেখ হাসিনা কাউকে দেননি। 

কৃষকলীগ পেকুয়া উপজেলার সাবেক যুগ্ম সম্পাদক মো. আলমগীর বলেন, এখানে আমরা ২শতাধিক আ’লীগের নেতা-কর্মীদের স্বত্ত আছে। কিন্তু এমপি সাহেব অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে মার্কেট নির্মাণকাজ আরম্ভ করেছে। এখানে প্রয়াত ফরিদ মেম্বারের জায়গাও রয়েছে। জোট সরকারের সময় নির্যাতিত হয়েছিলেন ফরিদ মেম্বার। এখন তিনি নাই। কিন্তু তার পরিবারকে নিয়ে জুলুম চলছে।

জেলা আ’লীগ সদস্য এস,এম গিয়াস উদ্দিন জানান, এমপি আমাদের সঙ্গে শর্ত ভঙ্গ করেছেন। আমরা আদালতে আশ্রয় নিয়েছি। উকিল কমিশন এসেছেন। স্থায়ী নিষেধাজ্ঞার জন্য আমরা আদালতের দ্বারস্থ হব। এখানে এক ইঞ্চি জমিও এমপির নামে নেই। তবে আ’লীগের নেতা-কর্মীদের হৃদয়করণ করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে সেই কাজ আমরা পেকুয়ায় করতে দেবনা ইনশাআল্লাহ।

নিউ মার্কেট নির্মাণকারী প্রতিষ্টান রিয়েলিটি ডেভলপার কোম্পানীর এমডি ছরওয়ার কামাল জানান, আসলে আমাদের সাথে চুক্তি হয়েছে এমপি মহোদয়ের। উনিসহ আরো কয়েকজন আছেন। ওনাদের নামে নামজারী খতিয়ান আছে। এর ভিত্তিতে আমরা চুক্তি করেছি ও মার্কেট নির্মাণ করছি।

বিডি প্রভাত/জেইচ