কাঁদছে রূপগঞ্জ, কাঁদছেন স্বজনরা

কাঁদছে রূপগঞ্জ, কাঁদছেন স্বজনরা

নিজস্ব প্রতিবেদক: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় আগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত ৫২ শ্রমিকের মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস। অধিকাংশ মরদেহই ভবনটির দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ তলা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। 

কারখানা থেকে লাশ বের করার সঙ্গে সঙ্গে কান্নার রোল পড়ে যাচ্ছে। কেউ কাঁদছেন সন্তানকে হারিয়ে, আবার কেউ আহাজারি করছেন মা-বাবাকে হারিয়ে। বেঁচে নেই নিশ্চিত হয়েও শুধু প্রিয়জনের দেহাবশেষের ছুঁয়ে দেখতে বুক চাপরাচ্ছেন কেউ কেউ।

শুক্রবার (৯ জুলাই) দুপুর আড়াইটা পর্যন্ত ওই ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে ৪৯ জনের পোড়া মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। আগের রাতে মারা যাওয়া তিনজনসহ নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫২ জন হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই পোড়া লাশ। চেনার উপায় নেই।

ঘটনাস্থলে উপস্থিত কারখানাটির শ্রমিক ও নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনদের অভিযোগ, আগুন লাগার শুরুর দিকে তিনতলা ও চারতলার কলাপসিবল গেট খুলে দিতে বললেও কর্তৃপক্ষ গেটগুলো খুলে দেয়নি। এ কারণেই এই দুই ফ্লোরের শ্রমিকরা বেশি মারা গেছেন। উপস্থিত অনেক শ্রমিকের দাবি, এখনো বেশকিছু শ্রমিক নিখোঁজ রয়েছেন। তাদের অবস্থান কত তলায় তা অবশ্য তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। 

নিখোঁজ শ্রমিকের স্বজনরা জানান, যখন ভবনে আগুনের সূত্রপাত হয় তখন কর্তৃপক্ষ তিন ও চারতলার দুই সেকশনেরই কলাপসিবল গেট বন্ধ করে দেয়। এতে ভেতরে প্রায় ১০০ শ্রমিক আটকা পড়েন। ভেতর থেকে তারা কেউই বের হয়ে আসতে পারেননি। তাদের মধ্যে দুই একজন লাফিয়ে নিচে পড়ে জীবন রক্ষা করতে পারলেও গুরুতর আহত হয়েছেন। 

স্বজনরা আরও অভিযোগ করেন, আগুন লাগার পর কারখানা কর্তৃপক্ষকে বার বার বলার পরেও তারা তিন ও চারতলার কলাপসিবল গেট খোলেনি। তারা যদি সময়মতো গেট খুলে দিত তাহলে এত শ্রমিকের প্রাণহানি হতো না। আগুন লাগার পরপরই তারা বেরিয়ে আসতে পারত।

বেশিরভাগ মানুষই জানান, আগুন প্রথম দিকে কম ছিল। ধীরে ধীরে বেড়েছে। কারখানার গেট খোলা থাকলে শ্রমিকরা বেরিয়ে আসতে পারতেন। অন্তত প্রাণহানি অনেক কম হতো বলে দাবি করেন তারা।

এদিকে ঘটনাস্থলে উপস্থিত থাকা কারখানার অনেক শ্রমিকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আটকে পড়া এবং নিহত শ্রমিকদের অধিকাংশই শিশু-কিশোর। যাদের বয়স ১৪ থেকে ১৬ বছরের মধ্যে।

জানা যায়, ভবনের চতুর্থ তলায় ললিপপ, তরল চকলেট, তৃতীয় তলায় অরগানিক পানীয় (জুস, লাচ্ছি), দোতলায় টোস্ট বিস্কুট, বিভিন্ন ধরনের পানীয় এবং নিচতলায় বাক্স ও পলিথিন তৈরির কারখানা ছিল।

পঞ্চমতলার একপাশে সেমাই, সেমাই ভাজার তেল, পলিথিন; অপর পাশে কারখানার গুদাম ছিল। কারখানার ষষ্ঠতলায় ছিল কার্টনের গুদাম। টানা ১৮ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ভবনটিতে ফাটলও দেখা দেয়

তবে কারখানার একটি সিঁড়ি বন্ধ না থাকলে অনেক প্রাণ বাঁচানো যেত বলে মনে করছেন ফায়ার সার্ভিসের উপপরিচালক দেবাশিষ বর্ধন। ঘটনাস্থলে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, আমরা গাড়ির মই সেট করে ছাদ থেকে ২৫ জনকে উদ্ধার করেছি। বাকিরা যদি ছাদে উঠতে পারত, আমরা কিন্তু বাঁচাতে পারতাম।

এদিকে ঢামেকের বাতাসে বাতাসে স্বজনদের কান্নার ধ্বনি। ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেকে) দুপুরে হঠাৎ সাইরেন বাজিয়ে মর্গের সামনে এসে দাঁড়ায় নারায়ণগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের পাঁচটি অ্যাম্বুলেন্স। একে একে অ্যাম্বুলেন্স নামানো হয় মরদেহগুলো। রাখা হয় ময়নাতদন্ত কক্ষের কাছেই ফাঁকা ঘরের মেঝেতে।

পরে এলো আরও চারটি অ্যাম্বুলেন্স। সবগুলো থেকে একইভাবে মরদেহ নামিয়ে ভেতরে নিয়ে মেঝেতে রাখা হয়। একপর্য়ায়ে ময়নাতদন্ত কক্ষের মেঝে মরদেহে ভরে যায়। ফলে বাকি মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের ঘরে নিয়ে টেবিলের ওপর রাখা হয়। কিন্তু তাতেও জায়গা হচ্ছিল না। ফলে ময়নাতদন্ত কক্ষের ফ্লোরের চারপাশে মরদেহ মোড়ানো ব্যাগগুলো রাখা হয়।

এদিকে স্বজন হারানোর বেদনায় ভারী হয়ে উঠেছে কারখানা এলাকা। কারখানা থেকে লাশ বের করার সঙ্গে সঙ্গে পড়ে যায় কান্নার রোল। স্বজনদের আহাজারিতে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

ঢামেক মর্গে যখন লাশগুলো আনতে থাকেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা, তখন সেখানে ছুটে যাচ্ছেন নিহতদের স্বজন ও সহকর্মীরা। পোড়া মৃতদেহগুলোর বেশিরভাগই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে। পুড়ে যাওয়া লাশের উৎকট গন্ধ আর লাশের বীভৎসতা কোনো কিছুর তোয়াক্কা না করেই প্রিয়জনদের খুঁজছেন স্বজনরা।

ঢামেক হাসপাতাল মর্গের মর্গ সরকারী সেকান্দার জানান, অ্যাম্বুলেন্স থেকে ৪৯টি মরদেহ নামানো হয়েছে। মরদেহ আনার ব্যাপারে ঢামেকের ফরেনসিক বিভাগের কর্মকর্তাকে অবগত করা হয়েছে।

ফায়ার সার্ভিস সূত্র জানায়, ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবোনিউক্লিক অ্যাসিড) পরীক্ষার মাধ্যমে মরদেহ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হবে। প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহতদের বেশিরভাগই শিশু। আগুনের ঘটনায় পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।

কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- রূপগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শাহ নুসরাত জাহান, জেলার ফায়ার সার্ভিসের উপসহকারী পরিচালক আবদুল্লাহ আল আরেফিন, জেলা পুলিশের একজন প্রতিনিধি, নিরাপদ খাদ্য অধিদফতর, বিএসটিআই এবং কলকারখানা অধিদফতরের জেলার একজন কর্মকর্তা।

বৃহস্পতিবার (৮ জুলাই) বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

কারখানাটির ভবনের নিচতলায় আগুন লাগে। মুহূর্তেই আগুন ভবনের অন্যান্য তলায় ছড়িয়ে পড়ে। আতঙ্কে শ্রমিকরা ভবনের ছাদে জড়ো হন। ছাদসহ বিভিন্ন তলা থেকে লাফিয়ে পড়েন অনেকে।

এ সময় প্রাণ বাঁচাতে ভবনটি থেকে লাফিয়ে পড়েন শ্রমিক স্বপ্না রানী (৪৫) ও মিনা আক্তার (৩৩)। ঘটনাস্থলেই তাঁরা দুজন মারা যান। এরপর মোরসালিন (২৮) নামের একজন শ্রমিক প্রাণ বাঁচাতে ওই ভবনের তৃতীয় তলা থেকে লাফ দেন। মোরসালিনকে রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। কারখানা থেকে শুক্রবার আরও ৪৯ জনের মরদেহ উদ্ধার করে ফায়ার সার্ভিস। 

বিডি প্রভাত/জেইচ