আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের করণীয়

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে আমাদের করণীয়

মুফতী মাহমুদ হাসান: পৃথিবীর সবকিছুই আল্লাহর সৃষ্টি ও অকৃপণ দান। ভাষাও এর ব্যতিক্রম নয়। ভাষা আল্লাহর দান, আল্লাহ তাআলার সেরা নেয়ামত; ভাষা মনুষ্য পরিচয়ের প্রধান বৈশিষ্ট্য। পৃথিবীর বিভিন্ন জাতির ভাষা ভিন্ন রকমের। এমনকি একই ভাষাভাষী মানুষের কণ্ঠস্বর ও উচ্চারণভঙ্গি পৃথক। এটা সম্পূর্ণ আল্লাহ পাকের কুদরতের নিদর্শন।

আল কুরআনের ভাষায়-‘আর তাঁর নিদর্শনাবলীর মধ্যে রয়েছে আসমান ও জমিনের সৃষ্টি এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বিভিন্নতার মধ্যে রয়েছে বিশ্ববাসীর জন্যে নিদর্শন। সুরা রুম, আয়াত ২২।

ইউকিপিডিয়ার তথ্যমতে, পৃথিবীতে এ পর্যন্ত প্রায় ৭৩৩০ টি ভাষার সন্ধান পাওয়া গেছে। তবে এতোগুলো ভাষার মাঝে প্রত্যেক জাতির কাছেই নিজ মাতৃভাষা অতি আপন, অতি প্রিয়, অতি শ্রদ্ধার। হৃদয়ের আবেগ মেটাতে পারে কেবলই মাতৃভাষা। কোন ভাষার সাথেই মাতৃভাষার তুলনা হয় না। আমাদের মাতৃভাষা বাংলা। এই মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষার মর্যাদা দেয়ার জন্য ১৩৫৯ বঙ্গাব্দের ৮ই ফাল্গুন (১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্র“য়ারি) ভাষা প্রেমিক রাজপথে নেমে ছিল এবং গুলির আঘাতে আহত হয়েছিল, শহীদ হয়েছিল,রক্তাক্ত হয়েছিল। এই অঞ্চলের মানুষ রক্ত দিয়ে তাদের মায়ের ভাষাকে হেফাজত করেছে। ছিনিয়ে নিয়েছে তারা এই গৌরবোজ্জ্বল বিজয়।

একুশে ফেব্রুয়ারি নয় ৮ই ফাল্গুন: একুশে ফেব্রুয়ারিতে যে মহান ব্যক্তিগন শহীদ হয়েছেন সালাম, বরকত, আব্দুল জব্বার প্রমূখ সকলেই মুসলমান ছিলেন। তারা বাংলা ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা করার জন্য তাদের আত্মাকে বিসর্জন দিয়েছেন এই দিনে। যেহেতু তারা বাংলা ভাষার জন্য প্রাণ দিয়েছেন। আমাদের উচিত ছিল শুরু থেকেই এই দিন বাংলা তারিখে পালন করা। অথচ এখানেও আমরা অপসংস্কৃতি তে আচ্ছাদিত।

১৯৫২ সালের একুশে ফেব্রুয়ারি ছিল ৮ই ফাল্গুন। এই ৮ই ফাল্গুন প্রতিবছর মাতৃভাষা দিবস হিসেবে হওয়া উচিত। যাতে যে ভাষার জন্য আমার ভাইয়েরা রক্ত দিয়েছেন সে ভাষার সাথে তারিখে মিল থাকে। এখানেও আমাদের একটা মন মনস্তাত্ত্বিক দ্বগ্ধ কাজ করছে। একদিকে আমরা এই দিবসকে বাংলা ভাষা দিবস হিসেবে পালন করি কিন্তু তা পালন করি ইংরেজি তারিখ অনুযায়ী একুশে ফেব্রুয়ারি।পালন করা দরকার ছিল আটই ফাল্গুন।

মাতৃভাষার প্রতি কেন এত উদাসীনতা? আজ আমরা মাতৃভাষার প্রতি উদাসীন। মাতৃভাষাকে উপেক্ষা করে আমরা বিদেশি ভাষার উপর ঝুঁকে পড়েছি। আমাদের অবশ্যই বিভিন্ন ভাষা শিখতে হবে ইসলামে টায় শিক্ষা দেয় কোন ভাষায় অবজ্ঞা করা যাবে না। তবে খেয়াল রাখতে হবে বিদেশি শব্দের অতিপ্রয়োগ যেন নিজের মায়ের ভাষাকে বিকৃত করে না দেয়।

ভাষা বিকৃতি ও মিশ্রকরণের কুপ্রভাব সমাজের সব স্তরেই দিন দিন বাড়ছে। পরিবারে, পথেঘাটে, অফিসে, বাজারে—সবখানেই যেন দিন দিন এর জয়জয়কার চলছে। অতি বিদেশপ্রেম ও স্মার্টনেস যেন আমাদের অস্তিত্বই বিলীন করে না দেয়। পাশাপাশি কেউ যেন কারো আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে কাউকে ছোট না করে। কারণ সব ভাষাই আল্লাহর সৃষ্টি। আল্লাহর সৃষ্টিকে তাচ্ছিল্য করার অধিকার কারো নেই।

ইসলামে মাতৃভাষার গুরুত্ব:ইসলামে মাতৃভাষা বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে।মহান স্রষ্টা নিজেও মাতৃভাষাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। যুগে যুগে মানুষের হেদায়াতের জন্য তিনি যত নবি-রাসূল পাঠিয়েছেন তাদের প্রত্যেককে মাতৃভাষায় যোগ্য ও দক্ষ করে পাঠিয়েছেন। যখন যে কিতাব অবতীর্ণ করেছেন তা নবিদের মাতৃভাষায় করেছেন।

মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বলেন, ‘আমি সব রাসূলকেই তাদের স্বজাতির ভাষাভাষী করে পাঠিয়েছি, যাতে তারা আমার বাণী স্পষ্টভাবে বোঝাতে পারে’। (সূরা ইবরাহিম: ৪ ) প্রত্যেক ভাষাভাষীর দায়িত্ব হলো, নিজ নিজ মাতৃভাষাকে সম্মানের সাথে চর্চার মাধ্যমে সমুজ্জ্বল করে তোলা। আমাদেরও উচিত হাজার বছরের ঐতিহ্যমণ্ডিত প্রিয় ভাষা বাংলাকে বিশ্বের দরবারে মহীয়ান করে তোলার জন্য আকুল প্রয়াস চালানো। তবেই মাতৃভাষার প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ পালিত হবে; স্রষ্টার নিয়ামতের যথার্থ কদর করায় আমরা বিশেষভাবে মূল্যায়িত হব।

আমাদের করণীয়:১.বাংলাভাষাকে যথাযথ মর্যাদা প্রদানের লক্ষ্যে ভাষাকে ভালভাবে রপ্ত করা এবং তা ভালভাবে ব্যবহার করে বাংলা ভাষার বহুল প্রচার-প্রসার ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে আরো এগিয়ে নেয়া। ভাষাগত ভুলত্রুটি এবং লেখার ক্ষেত্রে বানানগত ভুল হতে বেঁচে থাকার লক্ষ্যে সঠিকভাবে ভাষা শিক্ষার প্রতিজ্ঞা করা। সমাজে তার জনসচেতনতা বাড়ানো।বিজাতীয় ভাষা যথা ইংরেজি, হিন্দি, উর্দূ ভাষার কম ব্যবহার করে স্বভাষাকে গুরুত্বারোপ করা।

২.২১ ফেব্রয়ারির পরিবর্তে বাংলা তারিখ ৮ ফাল্গুন কে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে ঘোষণার জন্য প্রচার-প্রসার করা। আল্লাহ তাআলা ৮ই ফাল্গুন(একুশের) যে গৌরব আমাদেরকে দান করেছেন তার জন্য ইসলামের কল্যাণে এই অঞ্চলের মুসলমানদের কল্যাণে আমরা ব্যবহার করতে পারি তিনি আমাদেরকে তাওফীক দান করুন। আমীন।

বিডি প্রভাত/জেইচ